নিজস্ব প্রতিবেদক
পিএইচডিধারী শিক্ষক সংকটে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৪৯ জনেরই পিএইচডি ডিগ্রি নেই। পিএইচডিধারী শিক্ষক আছেন মাত্র ৫৫ জন। সমাজবিজ্ঞান, লোক প্রশাসন এবং ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগে এখনো কোনো পিএইচডিধারী শিক্ষক নেই।অন্যদিকে ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে মাত্র একজন করে শিক্ষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে বাংলা বিভাগ, যেখানে ছয়জন শিক্ষক এই ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া রসায়ন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান বিভাগে পাঁচজন করে পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন।পদার্থবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান এবং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে চারজন করে শিক্ষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে রয়েছেন তিনজন। এছাড়া গণিত, অর্থনীতি, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব এবং মার্কেটিং বিভাগে দুইজন করে পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মানোন্নয়ন এবং গবেষণার গতি বাড়াতে পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধির দাবি তুলেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের মতে, পিএইচডিধারী শিক্ষক কম থাকায় গবেষণায় তত্ত্বাবধায়ক সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে বিদেশি জার্নালে প্রকাশনা, উচ্চমানের গবেষণা এবং থিসিস সুপারভিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।তবে পিএইচডি ডিগ্রি না থাকা একাধিক শিক্ষক জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে তাদের একাধিক কোর্স নিতে হয়, ফলে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। পিএইচডি স্কলারশিপ পেলেও অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা জান্নাত তসি এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংকট রয়েছে। আমাদের ৭-৮টি করে কোর্স নিতে হয়। তার উপরে আবার যাদের অস্থায়ী নিয়োগ তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে পারেন না। তারা ছুটি পান না। পিএইচডির অফার থাকলেও তারা যেতে পারেন না। অস্থায়ী শিক্ষকদের স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে প্রশাসন উদাসীন এবং অস্থায়ী শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষক রাজনীতিও চরমে ওঠে। আর আমাদের চাকুরি স্থায়ী হতে হতে শিক্ষাজীবনে অনেক গ্যাপ পড়ে যায়। তখন পিএইচডি স্কলারশিপ পেতেও অনেক ক্ষেত্রে অসুবিধা হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মতিউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, একজন শিক্ষক নিজ উদ্যোগেই পিএইচডি করতে আগ্রহী থাকেন। তবে পর্যাপ্ত স্কলারশিপ ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেকে পিছিয়ে পড়েন। তবুও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে জ্ঞান সৃষ্টি ও সঠিকভাবে এর বিতরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ হলো পিএইচডি ডিগ্রি। এটি শিক্ষার্থীকে গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পদ্ধতি শেখায়।তিনি আরও বলেন, পিএইচডির মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান গভীরতর হয় এবং ছোট কোনো ইস্যুকেও বিশদভাবে অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়। উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য বিষয়ভিত্তিক গবেষণা অপরিহার্য, আর এর জন্য পিএইচডি ডিগ্রি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে”বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সম্প্রসারণ দপ্তরের পরিচালক ড. মো. ইলিয়াছ প্রামানিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রি—যেমন পিএইচডি বা এমফিল—আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়; এতে পাঠদানে সরাসরি কোনো বড় বাধা সৃষ্টি হয় না। তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত অর্থে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে গবেষণার বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা, আর সে কাজটি হয় গবেষণার মাধ্যমেই। যে শিক্ষক নিজে গবেষণায় সম্পৃক্ত নন, তিনি দক্ষ গবেষক তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না।তিনি আরও বলেন, উচ্চতর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক না হলেও মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক গবেষণায় যুক্ত থাকলে তিনি নিজে যেমন দক্ষ গবেষক হিসেবে গড়ে ওঠেন, তেমনি শিক্ষার্থীদেরও গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম হন। তাই একজন শিক্ষকের আগে নিজেকে গবেষক হিসেবে প্রস্তুত করা জরুরি।বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এখানেই—বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যা কলেজ পর্যায়ে সাধারণত সীমিত। ফলে যিনি নিজে গবেষণা করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে কার্যকরভাবে পথ দেখাতে পারেন না। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে এবং গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় সম্পৃক্ততা অপরিহার্য।বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে উচ্চশিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। যেসব শিক্ষক এখনো উচ্চতর ডিগ্রিধারী নন, তাদের জন্য পিএইচডিসহ উচ্চশিক্ষা অর্জন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ পদোন্নতির ক্ষেত্রেও এর প্রয়োজন রয়েছে।তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গবেষণা সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা, শিক্ষাকালীন ছুটি প্রদান এবং শিক্ষানিবেশ ভর্তুকি দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যাতে শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন।