হাম (Measles) আমাদের সমাজে খুব পরিচিত একটি নাম। অনেকেই একে সাধারণ জ্বর বা ‘মায়ের দয়া’ মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। সামান্য অসতর্কতা একটি শিশুর সারাজীবনের পঙ্গুত্ব বা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। আজকের ফিচারে আমরা জানবো কেন হামকে অবহেলা করা একেবারেই উচিত নয়।সংক্রমণের তীব্রতা কতটুকু?হামের ভাইরাস এতটাই শক্তিশালী যে, এটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসের সাহায্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১০ জন সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে আসলে, তাদের মধ্যে ৯ জনই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন যদি তাদের আগে থেকে টিকা নেওয়া না থাকে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর থেকে চলে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পরও ওই ঘরের বাতাসে ভাইরাসটি সক্রিয় থাকতে পারে।অবহেলার পরিণতি: মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিহামকে সাধারণ মনে করার ভুলটিই সবথেকে বড় বিপদ ডেকে আনে। সঠিক চিকিৎসা ও যত্ন না নিলে এটি নিচের জটিলতাগুলো তৈরি করতে পারে:মারাত্মক নিউমোনিয়া: হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণ।অন্ধত্ব: শরীরে ভিটামিন-এ এর অভাব থাকলে হামের ভাইরাস চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত করে শিশুকে চিরতরে অন্ধ করে দিতে পারে।এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ: এটি অত্যন্ত বিরল হলেও মারাত্মক। এতে শিশুর মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।কানের ইনফেকশন ও বধিরতা: অনেক ক্ষেত্রে হামের পর শিশু কানে কম শুনতে পায় বা কানে পুঁজ হওয়ার মতো সমস্যায় ভোগে।লক্ষণগুলো চিনবেন কীভাবে?হামের আক্রমণ শুরু হয় সাধারণ জ্বরের মতো। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে: ১. তীব্র জ্বরের সাথে নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া। ২. কাশির প্রকোপ বাড়া। ৩. গালের ভেতরের দিকে ছোট সাদাটে দাগ দেখা দেওয়া। ৪. ৩-৫ দিন পর মুখমণ্ডল থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়া।ভুল ধারণা বনাম সঠিক চিকিৎসাআমাদের গ্রামীণ সমাজে হাম নিয়ে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন হাম হলে তেল-সাবান ব্যবহার করা যাবে না বা শিশুকে খাবার কম দিতে হবে। চিকিৎসকদের মতে এগুলো সম্পূর্ণ ভুল।পরিচ্ছন্নতা: শিশুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখতে হবে।পুষ্টিকর খাবার: প্রচুর পানি, বুকের দুধ (শিশুদের ক্ষেত্রে) এবং তরল পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।ভিটামিন-এ: হামের জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি।প্রতিরোধের একমাত্র অস্ত্র: টিকাহাম প্রতিরোধের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই, তবে এটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। সরকারি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুকে ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ এমআর (MR) টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। টিকা নিলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় যা শিশুকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করে।আপনার সচেতনতাই পারে একটি শিশুকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে। হামের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। মনে রাখবেন, আজকের সচেতনতা আগামীর সুস্থ প্রজন্মের নিশ্চয়তা।