নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে জলদস্যুতা, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচিত জলদস্যু বাছেদ শিকদার (রাজু বাহিনীর সদস্য) আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের একটি অসাধু চক্রের সহযোগিতায় তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়, জমি দখল এবং মিথ্যা মামলায় হয়রানি করছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাছেদ শিকদার ও তার সহযোগীরা খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী, কৃষক ও জমির মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক সংশ্লিষ্ট মামলা দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ ব্যক্তিদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা মৎস্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত বাহনে অস্ত্র বা মাদক রেখে কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় সাজানো অভিযানের মাধ্যমে হয়রানি করা এবং মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বাছেদ শিকদারের বিরুদ্ধে অতীতেও জলদস্যুতা, অপহরণ ও দখলবাজির নানা অভিযোগ ছিল। ২০১৭ সালে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়ে তিনি এলাকায় অবস্থান নেন। কিছুদিন স্বাভাবিক জীবনে থাকার পর সম্প্রতি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তার বাহিনীর ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না কেউই।রূপসা ধানাধীন আলাইপুর গ্রামের ফাতেমা বেগম নামে এক নারী জানান, আমার স্বামী একজন মৎস্য ব্যবসায়ী। জলদস্যু বাছেদ শিকদার আমাদের কাছে এক লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। আমরা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জোরপূর্বক আমাদের জমি দখল করে নিয়েছে। আমরা বাধা দিতে গেলে জলদস্যু বাছেদ শিকদার আমার স্বামীকে হত্যার উদ্দেশ্যে পিস্তল দিয়ে গুলি করতে উদ্যত হন এবং তার বাহিনীর সদস্যরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের উপর দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। হামলার পর জলদস্যু বাছেদ শিকদার ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে কোস্টগার্ডের মাধ্যমে অস্ত্র ও মাদক দিয়ে’ মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিয়ে চলে যান। আমাদের নিরাপত্তার জন্য আমার স্বামী মোহাম্মদ আলী জলদস্যু বাছেদ শিকদারসহ আরও দুজনকে আসামী করে বিজ্ঞ আদালতে একটি মামলা করেন। যার মামলা নং- সিআর ৩১/২৫, তারিখ- ১৯/০৩/২০২৫ ইং। এর কিছুদিন পর সকালবেলায় আমার স্বামী মাছের রেনু পোনা নিয়ে বিক্রির উদ্দ্যেশে বাড়ি থেকে বের হলে জলদস্যু বাছেদ শিকদারের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কোস্টগার্ডের পেটি অফিসার আসাদুল বারীসহ সঙ্গীয় ফোর্সের কথিত মাদক উদ্ধার অভিযানে রূপসা ব্রিজের প্রধান সড়কের উপর রুপা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মাদক দিয়ে আটক করে আমার স্বামীকে লবণচরা থানায় হস্তান্তর করেন। বর্তমানে আমার স্বামী জলদস্যু বাছেদ শিকদারের ষড়যন্ত্রে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আছেন। কোস্টগার্ডের পেটি অফিসার আসাদুল বারী ভ্যানের চালক হেজবুল্লাহ’কে (বাছেদ শিকাদারের মামা) কৌশলে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দেন। এঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবী করে আমি প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সদরদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।একই গ্রামের ফারুক শিকদার নামে আরও এক ব্যক্তি জানান, জলদস্যু বাছেদ শিকদার ইতিপূর্বে আমার কাছেও চাঁদা দাবি করেন। আমি চাঁদা না দেওয়ায় আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিয়েছেন এবং আমার জমি দখলের চেষ্টা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আমি জলদস্যু বাছেদ শিকদারসহ তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে রূপসা থানায় জিডি এবং বিজ্ঞ আদালতে মামলা করেছি।তিনি আরও জানান, স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা জলদস্যু বাছেদ শিকদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে এসব কর্মকাণ্ডে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ফলে ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পাচ্ছেন না।একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা শফিউল্লাহ জানান, বাছেদ শিকদার সুন্দরবনে ডাকাতি করতো। তার নামে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, জমি দখল, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র মামলাসহ বহু মামলা রয়েছে। আত্মসমর্পণের পরও তিনি দেদারছে এসব কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, আমরা নিজেরাই ভুক্তভোগী কিন্তু মুখ খোলার সাহস নেই। মুখ খুললেই কোস্টগার্ডের সদস্যদের দিয়ে আমাদেরকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়। কোস্টগার্ডের সদস্যদের সাথে রয়েছে তার দহরম-মহরম। কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাদের গাড়িতে করে প্রায়ই সময় জলদস্যু বাছেদ শিকদারকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যান।আলাইপুর ৩নম্বর ওয়ার্ডের গ্রামপুলিশ নূর আলম জানান, বাছেদ শিকদার পূর্বে জলদস্যু ছিল। আত্মসমর্পণ করে তিনি ভালো হয়ে গেছেন। বসিরের কাছ থেকে বাছেদ শিকদারের ছোট ভাই আমিন শিকদার একটি জমি কিনেছে। ওই জমি নিয়েই ঝামেলা। যেহুতে দীর্ঘদিন জলদস্যুতা করেছে, কোস্টগার্ডের সাথে একটু সুসম্পর্ক থাকবে এটা স্বাভাবিক। তবে একটি মহলের কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বাছেদ শিকদারের বাড়িতে গেলে তিনি কৌশলে আত্মগোপনে চলে যান। এমনকি তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।জলদস্যু বাছেদ শিকদারের ছোট ভাই আমিন শিকদার জানান, আমার ভাই জলদস্যু ছিল। আত্মসমর্পণের পর থেকে সে ব্যবসা বাণিজ্য করেন। আমি এর বাইরে কিছুই জানি না। তবে বসির শিকদারের কাছ থেকে আমাদের একটি ক্রয়কৃত জমি নিয়ে ঝামেলা চলছে। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মিটিয়ে নিবো।বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড বিসিজি স্টেশন, রূপসা’র পেটি অফিসার আসাদুল বারী’র বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গেলে তিনি সাক্ষাৎ করেননি। এমনকি তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি কোন বক্তব্য প্রদান করেননি।কোস্টগার্ডের অভিযানে আটক আসামী লবণচরা থানায় হস্তান্তরের বিষয়ে লবণচরা থানার অফিসার ইনচার্জের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান, কোস্টগার্ডের পেটি অফিসার আসাদুল বারী আসামী আটক করে জব্দ তালিকা নিয়ে আসামীকে থানায় হস্তান্তর করেন। আমরা নিয়ম মোতাবেক আসামীকে আদালতে হাজির করেছি।এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তারা দাবি করেন।এদিকে বাছেদ শিকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।