ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি, যা ঈদুল আজহার মূল আকর্ষণ। এই ইবাদত কেবল পশু জবাই করার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর প্রতি বান্দার নিঃশর্ত আনুগত্য, সর্বোচ্চ ত্যাগ ও তাকওয়ার এক মহান প্রতীক। কোরবানি কবুলের মূল শর্তই হলো বিশুদ্ধ নিয়ত ও খোদাভীতি। তাই একজন কোরবানিদাতার উচিত কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এখন থেকেই যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা।কোরবানির আসল লক্ষ্য ‘তাকওয়া’কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। লোকদেখানো বা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতা কোরবানির আত্মাকে নষ্ট করে দেয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:"আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।" (সুরা আল-হাজ্জ : ৩৭)এই আয়াতটি মনে করিয়ে দেয় যে, কোরবানির আসল শিক্ষা হলো হৃদয়ের পবিত্রতা ও আল্লাহভীতি।কোরবানির ৫টি অগ্রিম প্রস্তুতি১. নিয়ত শুদ্ধ করা: কোরবানির প্রথম ও প্রধান প্রস্তুতি হলো নিয়তকে খাঁটি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" (বুখারি : ১)। তাই কোরবানি যেন কেবল গোশত খাওয়া বা লৌকিকতার উদ্দেশ্যে না হয়।২. হালাল উপার্জন নিশ্চিত করা: ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো হালাল রিজিক। কোরবানির পশুটি অবশ্যই সম্পূর্ণ হালাল উপার্জনের অর্থ দিয়ে কিনতে হবে। হারাম বা সন্দেহজনক উপার্জনের টাকা দিয়ে কোরবানি করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।৩. উত্তম ও সুস্থ পশু নির্বাচন: কোরবানির পশু হতে হবে ত্রুটিমুক্ত, হৃষ্টপুষ্ট ও নির্ধারিত বয়সের। রাসুল (সা.) বলেছেন, "চার ধরনের পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়— অন্ধ, রোগাক্রান্ত, খোঁড়া ও অত্যন্ত দুর্বল।" (আবু দাউদ)৪. নখ, চুল কাটা থেকে বিরত থাকা: যখন জিলহজ মাস শুরু হবে, তখন কোরবানিদাতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত আমল হলো নিজের চুল, নখ বা চামড়ার অংশ কাটা থেকে বিরত থাকা। হাদিস শরিফে এসেছে, "যে ব্যক্তি কোরবানি করতে চায়, সে যেন (জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে পশু জবাই পর্যন্ত) তার চুল ও নখ না কাটে।" (মুসলিম : ১৯৭৭)৫. জবাইয়ের নিয়ম ও দোয়া জেনে নেওয়া: সম্ভব হলে কোরবানি নিজের হাতে করা উত্তম, কারণ নবী কারীম (সা.) নিজের কোরবানি নিজেই করতেন। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত পশুর সামনে উপস্থিত থাকা ভালো। এছাড়া পশুকে কষ্ট না দিয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত জবাই করা এবং জবাইয়ের সময়ের দোয়া ও তাকবির (বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার) আগে থেকেই ভালোভাবে শিখে নেওয়া উচিত।জিলহজ মাসের বিশেষ আমলসমূহইবাদতে মনোযোগ বাড়ানো: জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এই দিনগুলোতে বেশি বেশি নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও ইস্তিগফার করা উচিত।আরাফার দিনের রোজা: ৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, "আরাফার দিনের রোজা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।" (মুসলিম)তাকবিরে তাশরিক পাঠ: ৯ জিলহজের ফজর থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পুরুষদের উচ্চস্বরে এবং নারীদের নিচুস্বরে ‘তাকবিরে তাশরিক’ (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ) পাঠ করা ওয়াজিব।সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব: গোশত বণ্টনকোরবানি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এর একটি সামাজিক ও মানবিক দিক রয়েছে যা সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে। কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা উত্তম এক ভাগ নিজের ও পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং বাকি এক ভাগ সমাজের গরিব ও অভাবী মানুষদের জন্য।কোরবানি একটি সামগ্রিক ইবাদত, যেখানে নিয়ত, ত্যাগ এবং মানবিকতা একসঙ্গে মিলিত হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার এবং তা সঠিক নিয়মে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।