সার্চ টুডে

পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার জমিদারবাড়ি



পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার জমিদারবাড়ি

পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলাতে জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা বনওয়ারীলাল রায়। জমিদার বনওয়ারীলাল রায়ের পূর্বপুরুষ ছিলেন তাড়াশের জমিদার বাসুদেব তালুকদার। বাসুদেব তালুকদার ঢাকার নবাব ইসলাম খাঁর একজন আস্থাভাজন কর্মচারী ছিলেন। নবাব তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ‘চৌধুরাই তারাশ’ নামক সম্পত্তি তাকে জায়গীর হিসেবে দান করেন। এবং ‘রায় চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তৎকালীন পরগাকাটার এলাকা রাজশাহীর সাঁতৈল রাজার জমিদারির অধীনে ছিল। সাঁতৈল রাজার দুইশত মৌজা নিয়ে ‘চৌধুরাই তারাশ’ জমিদারি গড়ে ওঠে।

জানা যায়, ফরিদপুরের অধিকংশ জায়গা অতীতে বন-জঙ্গলে ভরপুর ছিল। জমিদার বনওয়ারীলাল রায় মাঝে মাঝে এখানে পশু শিকারের জন্য আসতেন। জনশ্রুতি রয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে লাটের খাজনা দিতে পাবনা আসার পথে ফরিদপুরে তিনি বিশ্রাম করেন। এ সময় তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে পবিত্র স্থান মনে করে সৌভাগ্যের প্রতিক হিসাবে এখানে প্রাসাদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি তাড়াশের জমিদার বাড়ির অনুরূপ চারদিকে দিঘী খনন করে মাঝখানে জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন এবং জমিদারীর প্রধান অংশ এখানে হস্তান্তর করেন। তিনি তার নামানুসারে এখানকার নামকরণ করেন বনওয়ারীনগর। বর্তমান ফরিদপুর উপজেলা পরিষদ এই বনওয়ারীনগর মৌজায় নির্মিত প্রাসাদেই অবস্থিত। উপজেলা পরিষদের পুর্বদিকে রয়েছে বনওয়ারীনগর সি বি পাইলট সরকারি হাই স্কুল, বনওয়ারীনগর মাদ্রাসা ও সরকারি মোহাম্মদ ইয়াছিন ডিগ্রি কলেজ।

জমিদার বনওয়ারীলাল রায়ের স্থাপত্য শিল্পে যে প্রখর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তার প্রমাণ মেলে তাঁর নির্মিত চারিদিকে দিঘীবেষ্টিত একমাত্র প্রবেশপথ সমৃদ্ধ বাড়িটির স্থান নির্ধারণ, গঠন ও নির্মাণশৈলী দেখে। প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকতেই হাতি, তীরন্দাজ, দময়ুর ইত্যাদির আকৃতি খোচিত বিশাল গেট বিল্ডিং খুবই চিত্রাকর্ষক। গেটের ডানদিকে রয়েছে একটি একতলা বিল্ডিং। এটি ছিল জমিদারের রাজস্ব অফিস। এখানে খাজনা আদায় ও প্রজাদের অভাব অভিাযোগ শ্রবণের কাজ হতো। এ বিল্ডিংটির ঠিক একশত গজ দক্ষিণে রয়েছে একটি দোতলা বিল্ডিং। এটি ছিল কয়েদখানা ও টাকশাল। এর ডান পাশে টাকশালে লোহার সিন্দুকে রাজস্ব আদায় করে রাখা হতো। প্রাসাদের ঠিক একশত গজ দক্ষিণে রয়েছে আরও একটি বিল্ডিং এটি ছিল জমিদারের মূল বাসভবন। বাসভবন সংলগ্ন দিঘীর পানির মধ্যে তিনটি ধাপে ছাদবিহীন গোসলখানা ও রাণীর ঘাট। মূল বাসভবনের অনতিদূরেই দিঘীর পাড়ে রয়েছে দক্ষিণমুখী জমিদারের হাওয়াখানা। এ হাওয়াখানার একশত গজ পূর্বে রয়েছে আরও একটি একতলা বিল্ডিং। এটি ছিল বিনোদবিগ্রহ মন্দির। তাঁর লাগোয়া আরেকটি দোতলা বিল্ডিং এটি ছিল নাট্যমন্দির। বিল্ডিংগুলোতে রয়েছে হাতি, ঘোড়া, সাপ, তীরন্দাজ, ইত্যাদির আকৃতি খোচিত বিভিন্ন নকশা। বিনোদবিগ্রহ মন্দিরে পূজা-অর্চনা করা হতো। আর নাট্যমন্দিরে নাচ-গানসহ নানা রকম বিনোদন অনুষ্ঠান চলতো। বাড়িটির একহাজার গজ দূরে দুধসাগর বা দিঘীর পারে ছিল সারোদ গণপাঠাগার

তাড়াশের জমিদারদের মধ্যে বনওয়ারীলাল রায় খ্যাতিমান ছিলেন। তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ প্রতিষ্ঠায় অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। বনওয়ারীলাল রায়কে ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৪ সালে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। ১৯০৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দত্তকপুত্র বনমালী রায় তাড়াশের পরবর্তী জমিদার হন। তিনিও একজন খ্যাতিমান জমিদার ছিলেন। বনমালী রায় পাবনা শহরে ‘ইলিয়ট বনমালী টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ এবং সিরাজগঞ্জে ‘বনওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের নতুন ভবন নির্মাণেও তিনি অর্থ প্রদান করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯১৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর দুই পুত্র ক্ষিতিশভূষণ ও রাধিকাভূষণ ১৯৫০ সালের জমিদারি প্রথা বিলোপ পর্যন্ত তাড়াশের জমিদারি পরিচালনা করেন। মূলত, বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলের তিনটি উপজেলায় তাড়াশের জমিদারদের পর্যায়ক্রমিক বসতি ছিল। বসুদেব তালুকদার তাঁর তালুকদারি বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলায় শুরু করলেও এই বংশের পালিত পুত্র বনওয়ারীলাল রায় আবাস গেড়েছিলেন পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার বনওয়ারীনগরে। বনওয়ারীলাল রায়ের পুত্র বনমালী রায় আবাস গড়েছিলেন পাবনা জেলা শহরে। বনমালী রায়ের নির্মিত 'তাড়াশ ভবন' পাবনা শহরের একটি অনন্য সুন্দর স্থাপনা। বনওয়ারীলাল রায় তাড়াশ থেকে পাবনা যাতায়াত করতেন। নৌপথে বর্তমান ফরিদপুর উপজেলার চিকনাই নদী দিয়ে ঢুকে ইছামতী হয়ে।

আপনার মতামত লিখুন

সার্চ টুডে

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬


পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার জমিদারবাড়ি

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলাতে জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা বনওয়ারীলাল রায়। জমিদার বনওয়ারীলাল রায়ের পূর্বপুরুষ ছিলেন তাড়াশের জমিদার বাসুদেব তালুকদার। বাসুদেব তালুকদার ঢাকার নবাব ইসলাম খাঁর একজন আস্থাভাজন কর্মচারী ছিলেন। নবাব তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ‘চৌধুরাই তারাশ’ নামক সম্পত্তি তাকে জায়গীর হিসেবে দান করেন। এবং ‘রায় চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তৎকালীন পরগাকাটার এলাকা রাজশাহীর সাঁতৈল রাজার জমিদারির অধীনে ছিল। সাঁতৈল রাজার দুইশত মৌজা নিয়ে ‘চৌধুরাই তারাশ’ জমিদারি গড়ে ওঠে।

জানা যায়, ফরিদপুরের অধিকংশ জায়গা অতীতে বন-জঙ্গলে ভরপুর ছিল। জমিদার বনওয়ারীলাল রায় মাঝে মাঝে এখানে পশু শিকারের জন্য আসতেন। জনশ্রুতি রয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে লাটের খাজনা দিতে পাবনা আসার পথে ফরিদপুরে তিনি বিশ্রাম করেন। এ সময় তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে পবিত্র স্থান মনে করে সৌভাগ্যের প্রতিক হিসাবে এখানে প্রাসাদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি তাড়াশের জমিদার বাড়ির অনুরূপ চারদিকে দিঘী খনন করে মাঝখানে জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন এবং জমিদারীর প্রধান অংশ এখানে হস্তান্তর করেন। তিনি তার নামানুসারে এখানকার নামকরণ করেন বনওয়ারীনগর। বর্তমান ফরিদপুর উপজেলা পরিষদ এই বনওয়ারীনগর মৌজায় নির্মিত প্রাসাদেই অবস্থিত। উপজেলা পরিষদের পুর্বদিকে রয়েছে বনওয়ারীনগর সি বি পাইলট সরকারি হাই স্কুল, বনওয়ারীনগর মাদ্রাসা ও সরকারি মোহাম্মদ ইয়াছিন ডিগ্রি কলেজ।

জমিদার বনওয়ারীলাল রায়ের স্থাপত্য শিল্পে যে প্রখর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তার প্রমাণ মেলে তাঁর নির্মিত চারিদিকে দিঘীবেষ্টিত একমাত্র প্রবেশপথ সমৃদ্ধ বাড়িটির স্থান নির্ধারণ, গঠন ও নির্মাণশৈলী দেখে। প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকতেই হাতি, তীরন্দাজ, দময়ুর ইত্যাদির আকৃতি খোচিত বিশাল গেট বিল্ডিং খুবই চিত্রাকর্ষক। গেটের ডানদিকে রয়েছে একটি একতলা বিল্ডিং। এটি ছিল জমিদারের রাজস্ব অফিস। এখানে খাজনা আদায় ও প্রজাদের অভাব অভিাযোগ শ্রবণের কাজ হতো। এ বিল্ডিংটির ঠিক একশত গজ দক্ষিণে রয়েছে একটি দোতলা বিল্ডিং। এটি ছিল কয়েদখানা ও টাকশাল। এর ডান পাশে টাকশালে লোহার সিন্দুকে রাজস্ব আদায় করে রাখা হতো। প্রাসাদের ঠিক একশত গজ দক্ষিণে রয়েছে আরও একটি বিল্ডিং এটি ছিল জমিদারের মূল বাসভবন। বাসভবন সংলগ্ন দিঘীর পানির মধ্যে তিনটি ধাপে ছাদবিহীন গোসলখানা ও রাণীর ঘাট। মূল বাসভবনের অনতিদূরেই দিঘীর পাড়ে রয়েছে দক্ষিণমুখী জমিদারের হাওয়াখানা। এ হাওয়াখানার একশত গজ পূর্বে রয়েছে আরও একটি একতলা বিল্ডিং। এটি ছিল বিনোদবিগ্রহ মন্দির। তাঁর লাগোয়া আরেকটি দোতলা বিল্ডিং এটি ছিল নাট্যমন্দির। বিল্ডিংগুলোতে রয়েছে হাতি, ঘোড়া, সাপ, তীরন্দাজ, ইত্যাদির আকৃতি খোচিত বিভিন্ন নকশা। বিনোদবিগ্রহ মন্দিরে পূজা-অর্চনা করা হতো। আর নাট্যমন্দিরে নাচ-গানসহ নানা রকম বিনোদন অনুষ্ঠান চলতো। বাড়িটির একহাজার গজ দূরে দুধসাগর বা দিঘীর পারে ছিল সারোদ গণপাঠাগার

তাড়াশের জমিদারদের মধ্যে বনওয়ারীলাল রায় খ্যাতিমান ছিলেন। তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ প্রতিষ্ঠায় অর্থ সহায়তা প্রদান করেন। বনওয়ারীলাল রায়কে ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৪ সালে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। ১৯০৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দত্তকপুত্র বনমালী রায় তাড়াশের পরবর্তী জমিদার হন। তিনিও একজন খ্যাতিমান জমিদার ছিলেন। বনমালী রায় পাবনা শহরে ‘ইলিয়ট বনমালী টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ এবং সিরাজগঞ্জে ‘বনওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের নতুন ভবন নির্মাণেও তিনি অর্থ প্রদান করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯১৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর দুই পুত্র ক্ষিতিশভূষণ ও রাধিকাভূষণ ১৯৫০ সালের জমিদারি প্রথা বিলোপ পর্যন্ত তাড়াশের জমিদারি পরিচালনা করেন। মূলত, বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলের তিনটি উপজেলায় তাড়াশের জমিদারদের পর্যায়ক্রমিক বসতি ছিল। বসুদেব তালুকদার তাঁর তালুকদারি বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলায় শুরু করলেও এই বংশের পালিত পুত্র বনওয়ারীলাল রায় আবাস গেড়েছিলেন পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার বনওয়ারীনগরে। বনওয়ারীলাল রায়ের পুত্র বনমালী রায় আবাস গড়েছিলেন পাবনা জেলা শহরে। বনমালী রায়ের নির্মিত 'তাড়াশ ভবন' পাবনা শহরের একটি অনন্য সুন্দর স্থাপনা। বনওয়ারীলাল রায় তাড়াশ থেকে পাবনা যাতায়াত করতেন। নৌপথে বর্তমান ফরিদপুর উপজেলার চিকনাই নদী দিয়ে ঢুকে ইছামতী হয়ে।


সার্চ টুডে

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজাম্মুল হোসেন
বার্তা সম্পাদক: মোঃ হুমায়ূন কবীর
লিগ্যাল এডভাইজার: সৌরভ গাঙ্গুলি
উপদেষ্টা: সাজ্জাদ আলম খান সজল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সার্চটুডে