সার্চ টুডে

ইতিহাসের পাতায় মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা সংগ্রাম



ইতিহাসের পাতায় মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা সংগ্রাম

প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘মহান মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’। বর্তমানে এটি কেবল একটি ছুটির দিন বা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলেও, এর পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অধিকার আদায়ের এক দীর্ঘ ইতিহাস। শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং মানবিক মর্যাদার দাবিতে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপ ও আমেরিকার কলকারখানাগুলোতে শ্রমিকদের জীবন ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। তখন কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। একজন শ্রমিককে দিনে গড়ে ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হতো। অত্যন্ত স্বল্প মজুরি এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল— "আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা বিনোদন।"

১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সিদ্ধান্ত নেয় যে, ১৮৮৬ সালের ১লা মে থেকে তারা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি কার্যকর করবে। এই দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।

১ মে, ১৮৮৬: শিকাগোর 'হে মার্কেট' মোড়সহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক কাজ ফেলে রাজপথে নেমে আসেন। শান্তিপূর্ণ এই ধর্মঘটে থমকে যায় গোটা শহর।

৩ মে, ১৮৮৬: ধর্মঘটী শ্রমিকদের ওপর পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায়। এতে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারান এবং অনেকে আহত হন।

৪ মে, ১৮৮৬: সহকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে শ্রমিকরা শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করেন। সমাবেশের শেষ পর্যায়ে হঠাৎ এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি পুলিশের ওপর বোমা নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তখন শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে অন্তত ১১ জন শ্রমিক নিহত হন এবং শত শত শ্রমিক আহত হন।

আন্দোলনের দায়ে আটজন শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর চারজন নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একজন কারাবরণকালেই আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছিল যে শ্রমিক নেতারা নির্দোষ ছিলেন।

১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে’ শিকাগোর শ্রমিকদের এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ১লা মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মে দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে এবং দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। বাংলাদেশের শ্রম আইনেও শ্রমিকদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

মে দিবস কেবল একটি উৎসব নয়, এটি শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার। শিকাগোর সেই রাজপথে ঝরা রক্তই আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ এবং ন্যায্য অধিকারের আইনি ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। তবে আজও বিশ্বের অনেক জায়গায় শ্রমিকরা শোষিত হচ্ছে, তাই মে দিবসের চেতনা বর্তমান সময়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও ঐতিহাসিক নথিপত্র।

আপনার মতামত লিখুন

সার্চ টুডে

শনিবার, ০২ মে ২০২৬


ইতিহাসের পাতায় মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার আদায়ের রক্তঝরা সংগ্রাম

প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬

featured Image

প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘মহান মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’। বর্তমানে এটি কেবল একটি ছুটির দিন বা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলেও, এর পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অধিকার আদায়ের এক দীর্ঘ ইতিহাস। শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং মানবিক মর্যাদার দাবিতে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপ ও আমেরিকার কলকারখানাগুলোতে শ্রমিকদের জীবন ছিল অত্যন্ত দুর্বিষহ। তখন কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। একজন শ্রমিককে দিনে গড়ে ১৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হতো। অত্যন্ত স্বল্প মজুরি এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল— "আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা বিনোদন।"

১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সিদ্ধান্ত নেয় যে, ১৮৮৬ সালের ১লা মে থেকে তারা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি কার্যকর করবে। এই দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।

১ মে, ১৮৮৬: শিকাগোর 'হে মার্কেট' মোড়সহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক কাজ ফেলে রাজপথে নেমে আসেন। শান্তিপূর্ণ এই ধর্মঘটে থমকে যায় গোটা শহর।

৩ মে, ১৮৮৬: ধর্মঘটী শ্রমিকদের ওপর পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায়। এতে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারান এবং অনেকে আহত হন।

৪ মে, ১৮৮৬: সহকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে শ্রমিকরা শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করেন। সমাবেশের শেষ পর্যায়ে হঠাৎ এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি পুলিশের ওপর বোমা নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তখন শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে অন্তত ১১ জন শ্রমিক নিহত হন এবং শত শত শ্রমিক আহত হন।

আন্দোলনের দায়ে আটজন শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর চারজন নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একজন কারাবরণকালেই আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছিল যে শ্রমিক নেতারা নির্দোষ ছিলেন।

১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে’ শিকাগোর শ্রমিকদের এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ১লা মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মে দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে এবং দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। বাংলাদেশের শ্রম আইনেও শ্রমিকদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

মে দিবস কেবল একটি উৎসব নয়, এটি শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার। শিকাগোর সেই রাজপথে ঝরা রক্তই আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ এবং ন্যায্য অধিকারের আইনি ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। তবে আজও বিশ্বের অনেক জায়গায় শ্রমিকরা শোষিত হচ্ছে, তাই মে দিবসের চেতনা বর্তমান সময়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও ঐতিহাসিক নথিপত্র।


সার্চ টুডে

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজাম্মুল হোসেন
বার্তা সম্পাদক: মোঃ হুমায়ূন কবীর
লিগ্যাল এডভাইজার: সৌরভ গাঙ্গুলি
উপদেষ্টা: সাজ্জাদ আলম খান সজল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সার্চটুডে