সার্চ টুডে

সীমান্তে ‘সেফ রুট’ বানিয়ে চলছে ভারতীয় গরু পাচার



সীমান্তে ‘সেফ রুট’ বানিয়ে চলছে ভারতীয় গরু পাচার
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জহুরপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে গরু পাচারের ‍দৃশ্য।

কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তজুড়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারতীয় গরু চোরাচালান চক্র। পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চল, নদীপথ এবং কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত ব্যবহার করে গভীর রাতে দেশে প্রতিদিনই প্রবেশ করছে শত শত ভারতীয় গরু। সীমান্তে বিজিবির টহল ও অভিযান চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।

জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি সীমান্ত রুট বর্তমানে চোরাকারবারিদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পদ্মা নদীসংলগ্ন চরাঞ্চল ও অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে ছোট ছোট দলে গরু এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের মনাকষা বিওপি এলাকা, ওহেদপুর, মনোহরপুর এবং মাসুদপুর সীমান্ত এলাকাকে চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, চোরাকারবারিরা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে একটি ‘সেফ রুট’ তৈরি করেছে।


এর আগে সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্তের ওপারে নির্দিষ্ট পয়েন্টে গরু জড়ো করা হয়। রাত গভীর হলে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে চোরাকারবারিরা গরুগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে নিয়ে আসে। যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই কিংবা নদীর চর রয়েছে, সেসব স্থানই বেশি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে চরাঞ্চল, ফসলি জমি হিসেবে বেছে নেয় তারা। এ সময় চোরাচালানকারীরা অনেক সময় গরুর মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়, যেন শব্দ না হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে গরুর পায়ের সঙ্গে কাপড় পেঁচিয়ে দেওয়া হয়, যাতে হাঁটার শব্দ কমে যায়। পরে স্থানীয় দালালদের সহায়তায় শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত এলাকা পার করে আনা হয়, সেগুলোকে পরবর্তীতে সদরের নারায়ণপুর এলাকা দিয়ে নিরাপদে মূল গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এরপর দ্রুত সেগুলো দেশের বিভিন্ন হাটে পৌঁছে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সীমান্ত থেকে শুরু করে পরিবহন, অস্থায়ী খামার ও পশুর হাট পর্যন্ত রয়েছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। অনেক ক্ষেত্রে গরু আনার পর কয়েকদিন গ্রামের নির্জন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়, যাতে অভিযান চালালেও সহজে উদ্ধার করা না যায়।

বাখের আলী সীমান্তে রাত ১টা বাজলে আনাগোনা বাড়ে চোরাচালান চক্রের নিয়োগ করা লাইনম্যানদের। তাদের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে রাখালরা একে একে গরু নিয়ে আসতে থাকে। তবে এ সময় চোখে পড়েনি সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা বিজিবি সদস্যদের। এ সময় চোরাচালানে যুক্ত রাখালদের হাতে থাকে দেশীয় অস্ত্র। ফলে অচেনা মানুষ দেখলে তারা ধাওয়া করে।

গরু চোরাচালানের মূলে ৮ হোতা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জহুরপুর ও জহুরপুরটেক এলাকায় এই অবৈধ কারবার নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে কাজ করছে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। জহুরপুর বিওপি এলাকার সাদেক, আবু, ইকবাল ও মামুন এবং জহুরপুরটেক সীমান্তের ডলার, মুকুল, কুতুবুল ও তৌহিদ এই সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে পরিচিত। তারা মূলত গভীর রাতকে কাজে লাগিয়ে কলাগাছের ভেলা অথবা নৌকায় নদী পার করে গরু নিয়ে আসে। অভিযোগ উঠেছে, এই ৮ হোতা বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করার নামে গরুপ্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা চাঁদা তুলে। পাচার করা গরুগুলো প্রথমে সীমান্তসংলগ্ন আম বাগান বা ফসলি জমিতে লুকিয়ে রাখা হয় এবং পরে সিন্ডিকেটের লাইনম্যানদের সংকেত অনুযায়ী রাতের অন্ধকারে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এসব অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তি এশিয়া পোস্টের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। এমনকি মোবাইল ফোনে প্রতিবেদককে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।

মরণখেলা চলে ৩০-৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে

সীমান্তের ওপার থেকে গরু এনে দিলেই মিলছে মোটা অঙ্কের টাকা-সিন্ডিকেটের এমন লোভনীয় প্রলোভনে পড়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে পা বাড়াচ্ছে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ। অথচ সীমান্ত পারাপারের এই মরণখেলায় মূলহোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও লাশ হয়ে ফিরছে কিংবা জেল খাটছে কেবলই মাঠপর্যায়ের বাহকরা।

চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের ঘুঘুডাঙ্গা এলাকার আকুমদ্দিনের ছেলে আব্দুর রহিম (৪৫) গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের হাতে আটক হন। নির্যাতনে তার মৃত্যু হলে মরদেহ পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরে স্বজনরা নদী থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে গোপনে দাফন সম্পন্ন করেন। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে একই কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন আব্দুর রহিমের আপন ভাই ইব্রাহীমও। তবে এ বিষয়ে আতঙ্কে মুখ খুলতে রাজি হয়নি নিহতের পরিবার।

গত ১১ মে রাত ১টার দিকে ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের জহুরপুর টেক বিওপির সীমান্ত পিলার ২৩/৭ এস-এর কাছ দিয়ে ১০-১৫ জনের একটি দল অবৈধভাবে গরু আনতে ভারতে প্রবেশ করে। ওই ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন রাখাল শওকত আলী। এর ৫ দিন পর গত ১৬ মে বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের হাকিমপুর এলাকা থেকে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে ছিল পৈশাচিক আঘাতের চিহ্ন।

সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন মর্মান্তিক ঘটনার সংখ্যা এখন অগণিত, যার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায় না।সীমান্ত এলাকার দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে মূল গডফাদাররা সাধারণ মানুষকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছে। টাকার লোভে পড়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে ও নির্মম শারীরিক নির্যাতনে বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবগঞ্জের এক রাখাল জানান, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে দেদার গরু আসছে। ওপার (ভারত) থেকে গরু পার করে এপারে আনার জন্য দালালরা আমাদের প্রতি খেপে (বার) ৩০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে। এত টাকার লোভ সামলানো কঠিন, তাই জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও আমরা যাচ্ছি।

মে মাসে ৭৮ লাখ টাকার গরু জব্দ

সবশেষ গত সোমবার (১৮ মে) রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলে পৃথক অভিযান চালিয়ে ১৪টি ভারতীয় গরু জব্দ করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। জব্দ করা এই গরুগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। বিজিবি জানায়, গত সোমবার রাত ১টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে ৫টি পৃথক অভিযান চালানো হয়।

এর মধ্যে মাসুদপুর বিওপি নিশিপাড়া গ্রাম থেকে ১টি, জহুরপুর বিওপি খলিফারচর এলাকা থেকে ৩টি, বাখেরআলী বিওপি সোনাদিয়াচর এলাকা থেকে ৪টি, ফরিদপুর বিওপি কদমতলীচর এলাকা থেকে ৪টি এবং মনাকষা বিওপি কদমতলা এলাকা থেকে ২টি ভারতীয় গরু জব্দ করে। চলতি মে মাসেই ৫৩ বিজিবির আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন অভিযানে এখন পর্যন্ত মোট ৩৩টি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়েছে। এসব গরুর মূল্য প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। এই তথ্য ৫৩ বিজিবির সদর দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

কাঁটাতারহীন অরিক্ষত সীমান্তে যেভাবে ঢুকে গরু

কাঁটাতার নেই ৩৯ কিমি সীমান্তে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সঙ্গে ভারতের মোট ১৩১ দশমিক ৩ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই বিশাল এলাকা পাহারার দায়িত্বে রয়েছে বিজিবির ৫৩ ও ৫৯ ব্যাটালিয়ন। এর মধ্যে ৫৩ বিজিবির অধীনে ৫৪ কিলোমিটার এবং ৫৯ বিজিবির অধীনে ৭৭ দশমিক ৩ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সীমান্তের মধ্যে এখনও ৩৯ কিলোমিটার এলাকায় কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। যার মধ্যে ৫৩ বিজিবির অধীনেই রয়েছে ৩৭ কিলোমিটার এবং ৫৯ বিজিবির অধীনে মাত্র ২ কিলোমিটার উন্মুক্ত সীমান্ত। এই বেড়াহীন ৩৯ কিলোমিটার সীমান্ত ও পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চলকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাচালান সিন্ডিকেট। মূলত ৫৯ বিজিবির চেয়ে ৫৩ বিজিবির সীমান্ত এলাকা বেশি অরক্ষিত থাকায় এই ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ রুটগুলো দিয়েই ভারতীয় গরু বেশি ঢুকছে।

সীমান্তপথে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু আসায় চরম ক্ষোভ ও লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের খামারিরা। জেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত পশু থাকা সত্ত্বেও চোরাই গরুর কারণে বাজারে ধস নেমেছে। খামারিদের অভিযোগ, চড়া দামে গো-খাদ্য কিনে এবং ব্যাংকঋণ নিয়ে তারা পশু লালন-পালন করলেও প্রশাসনের চোখের সামনেই হাটে হাটে কম দামে বিক্রি হচ্ছে চোরাই গরু।

শিবগঞ্জের কালুপুর এলাকার খামারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এবারের ঈদের জন্য ১০টি গরু প্রস্তুত করেছি। সব পুঁজি খাটিয়ে খামার গড়ে এখন চরম আতঙ্কে আছি। হাটে তিনটি গরু তুলেছিলাম কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম পাইনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনজের আলম মানিক বলেন, এবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে খামারিরা তাদের সর্বোচ্চটা বিলিয়ে দিয়েছে। গোখাদ্যসহ সব কিছুরই বাড়তি দাম, কিন্তু এখন তারা হতাশায় ভুগছে। কারণ ভারতী থেকে অবৈধ ভাবে গরু আসছে। খামারিদের বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।


যা বলছে বিজিবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করাসহ যেকোনো অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধ প্রতিরোধে ৫৩ বিজিবি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরু ও মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে ৫৩ বিজিবি সংকল্পবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সীমান্তের দুর্গম এলাকায় ও নদী পথে অতিরিক্ত বিশেষ টহল, চেকপোস্ট পরিচালনা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

সার্চ টুডে

রোববার, ২৪ মে ২০২৬


সীমান্তে ‘সেফ রুট’ বানিয়ে চলছে ভারতীয় গরু পাচার

প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

featured Image

কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তজুড়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারতীয় গরু চোরাচালান চক্র। পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চল, নদীপথ এবং কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত ব্যবহার করে গভীর রাতে দেশে প্রতিদিনই প্রবেশ করছে শত শত ভারতীয় গরু। সীমান্তে বিজিবির টহল ও অভিযান চললেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।


জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি সীমান্ত রুট বর্তমানে চোরাকারবারিদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পদ্মা নদীসংলগ্ন চরাঞ্চল ও অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে ছোট ছোট দলে গরু এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।


সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের মনাকষা বিওপি এলাকা, ওহেদপুর, মনোহরপুর এবং মাসুদপুর সীমান্ত এলাকাকে চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, চোরাকারবারিরা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে একটি ‘সেফ রুট’ তৈরি করেছে।


এর আগে সন্ধ্যার পর থেকেই সীমান্তের ওপারে নির্দিষ্ট পয়েন্টে গরু জড়ো করা হয়। রাত গভীর হলে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে চোরাকারবারিরা গরুগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে নিয়ে আসে। যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই কিংবা নদীর চর রয়েছে, সেসব স্থানই বেশি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে চরাঞ্চল, ফসলি জমি হিসেবে বেছে নেয় তারা। এ সময় চোরাচালানকারীরা অনেক সময় গরুর মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়, যেন শব্দ না হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে গরুর পায়ের সঙ্গে কাপড় পেঁচিয়ে দেওয়া হয়, যাতে হাঁটার শব্দ কমে যায়। পরে স্থানীয় দালালদের সহায়তায় শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত এলাকা পার করে আনা হয়, সেগুলোকে পরবর্তীতে সদরের নারায়ণপুর এলাকা দিয়ে নিরাপদে মূল গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এরপর দ্রুত সেগুলো দেশের বিভিন্ন হাটে পৌঁছে দেওয়া হয়।


সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সীমান্ত থেকে শুরু করে পরিবহন, অস্থায়ী খামার ও পশুর হাট পর্যন্ত রয়েছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। অনেক ক্ষেত্রে গরু আনার পর কয়েকদিন গ্রামের নির্জন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়, যাতে অভিযান চালালেও সহজে উদ্ধার করা না যায়।


বাখের আলী সীমান্তে রাত ১টা বাজলে আনাগোনা বাড়ে চোরাচালান চক্রের নিয়োগ করা লাইনম্যানদের। তাদের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে রাখালরা একে একে গরু নিয়ে আসতে থাকে। তবে এ সময় চোখে পড়েনি সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা বিজিবি সদস্যদের। এ সময় চোরাচালানে যুক্ত রাখালদের হাতে থাকে দেশীয় অস্ত্র। ফলে অচেনা মানুষ দেখলে তারা ধাওয়া করে।

গরু চোরাচালানের মূলে ৮ হোতা


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জহুরপুর ও জহুরপুরটেক এলাকায় এই অবৈধ কারবার নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে কাজ করছে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। জহুরপুর বিওপি এলাকার সাদেক, আবু, ইকবাল ও মামুন এবং জহুরপুরটেক সীমান্তের ডলার, মুকুল, কুতুবুল ও তৌহিদ এই সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে পরিচিত। তারা মূলত গভীর রাতকে কাজে লাগিয়ে কলাগাছের ভেলা অথবা নৌকায় নদী পার করে গরু নিয়ে আসে। অভিযোগ উঠেছে, এই ৮ হোতা বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করার নামে গরুপ্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা চাঁদা তুলে। পাচার করা গরুগুলো প্রথমে সীমান্তসংলগ্ন আম বাগান বা ফসলি জমিতে লুকিয়ে রাখা হয় এবং পরে সিন্ডিকেটের লাইনম্যানদের সংকেত অনুযায়ী রাতের অন্ধকারে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এসব অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তি এশিয়া পোস্টের কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। এমনকি মোবাইল ফোনে প্রতিবেদককে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।


মরণখেলা চলে ৩০-৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে


সীমান্তের ওপার থেকে গরু এনে দিলেই মিলছে মোটা অঙ্কের টাকা-সিন্ডিকেটের এমন লোভনীয় প্রলোভনে পড়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে পা বাড়াচ্ছে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ। অথচ সীমান্ত পারাপারের এই মরণখেলায় মূলহোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও লাশ হয়ে ফিরছে কিংবা জেল খাটছে কেবলই মাঠপর্যায়ের বাহকরা।


চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের ঘুঘুডাঙ্গা এলাকার আকুমদ্দিনের ছেলে আব্দুর রহিম (৪৫) গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের হাতে আটক হন। নির্যাতনে তার মৃত্যু হলে মরদেহ পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। পরে স্বজনরা নদী থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে গোপনে দাফন সম্পন্ন করেন। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে একই কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন আব্দুর রহিমের আপন ভাই ইব্রাহীমও। তবে এ বিষয়ে আতঙ্কে মুখ খুলতে রাজি হয়নি নিহতের পরিবার।


গত ১১ মে রাত ১টার দিকে ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের জহুরপুর টেক বিওপির সীমান্ত পিলার ২৩/৭ এস-এর কাছ দিয়ে ১০-১৫ জনের একটি দল অবৈধভাবে গরু আনতে ভারতে প্রবেশ করে। ওই ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন রাখাল শওকত আলী। এর ৫ দিন পর গত ১৬ মে বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের হাকিমপুর এলাকা থেকে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে ছিল পৈশাচিক আঘাতের চিহ্ন।


সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন মর্মান্তিক ঘটনার সংখ্যা এখন অগণিত, যার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায় না।সীমান্ত এলাকার দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে মূল গডফাদাররা সাধারণ মানুষকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাচ্ছে। টাকার লোভে পড়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে ও নির্মম শারীরিক নির্যাতনে বিদেশের মাটিতে প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিবগঞ্জের এক রাখাল জানান, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে দেদার গরু আসছে। ওপার (ভারত) থেকে গরু পার করে এপারে আনার জন্য দালালরা আমাদের প্রতি খেপে (বার) ৩০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিচ্ছে। এত টাকার লোভ সামলানো কঠিন, তাই জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও আমরা যাচ্ছি।


মে মাসে ৭৮ লাখ টাকার গরু জব্দ


সবশেষ গত সোমবার (১৮ মে) রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলে পৃথক অভিযান চালিয়ে ১৪টি ভারতীয় গরু জব্দ করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। জব্দ করা এই গরুগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। বিজিবি জানায়, গত সোমবার রাত ১টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে ৫টি পৃথক অভিযান চালানো হয়।


এর মধ্যে মাসুদপুর বিওপি নিশিপাড়া গ্রাম থেকে ১টি, জহুরপুর বিওপি খলিফারচর এলাকা থেকে ৩টি, বাখেরআলী বিওপি সোনাদিয়াচর এলাকা থেকে ৪টি, ফরিদপুর বিওপি কদমতলীচর এলাকা থেকে ৪টি এবং মনাকষা বিওপি কদমতলা এলাকা থেকে ২টি ভারতীয় গরু জব্দ করে। চলতি মে মাসেই ৫৩ বিজিবির আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন অভিযানে এখন পর্যন্ত মোট ৩৩টি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়েছে। এসব গরুর মূল্য প্রায় ৭৮ লাখ টাকা। এই তথ্য ৫৩ বিজিবির সদর দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।


কাঁটাতারহীন অরিক্ষত সীমান্তে যেভাবে ঢুকে গরু


কাঁটাতার নেই ৩৯ কিমি সীমান্তে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সঙ্গে ভারতের মোট ১৩১ দশমিক ৩ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই বিশাল এলাকা পাহারার দায়িত্বে রয়েছে বিজিবির ৫৩ ও ৫৯ ব্যাটালিয়ন। এর মধ্যে ৫৩ বিজিবির অধীনে ৫৪ কিলোমিটার এবং ৫৯ বিজিবির অধীনে ৭৭ দশমিক ৩ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সীমান্তের মধ্যে এখনও ৩৯ কিলোমিটার এলাকায় কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই। যার মধ্যে ৫৩ বিজিবির অধীনেই রয়েছে ৩৭ কিলোমিটার এবং ৫৯ বিজিবির অধীনে মাত্র ২ কিলোমিটার উন্মুক্ত সীমান্ত। এই বেড়াহীন ৩৯ কিলোমিটার সীমান্ত ও পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চলকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাচালান সিন্ডিকেট। মূলত ৫৯ বিজিবির চেয়ে ৫৩ বিজিবির সীমান্ত এলাকা বেশি অরক্ষিত থাকায় এই ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ রুটগুলো দিয়েই ভারতীয় গরু বেশি ঢুকছে।




সীমান্তপথে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু আসায় চরম ক্ষোভ ও লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের খামারিরা। জেলায় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত পশু থাকা সত্ত্বেও চোরাই গরুর কারণে বাজারে ধস নেমেছে। খামারিদের অভিযোগ, চড়া দামে গো-খাদ্য কিনে এবং ব্যাংকঋণ নিয়ে তারা পশু লালন-পালন করলেও প্রশাসনের চোখের সামনেই হাটে হাটে কম দামে বিক্রি হচ্ছে চোরাই গরু।


শিবগঞ্জের কালুপুর এলাকার খামারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এবারের ঈদের জন্য ১০টি গরু প্রস্তুত করেছি। সব পুঁজি খাটিয়ে খামার গড়ে এখন চরম আতঙ্কে আছি। হাটে তিনটি গরু তুলেছিলাম কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম পাইনি।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনজের আলম মানিক বলেন, এবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে খামারিরা তাদের সর্বোচ্চটা বিলিয়ে দিয়েছে। গোখাদ্যসহ সব কিছুরই বাড়তি দাম, কিন্তু এখন তারা হতাশায় ভুগছে। কারণ ভারতী থেকে অবৈধ ভাবে গরু আসছে। খামারিদের বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।


যা বলছে বিজিবি


চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করাসহ যেকোনো অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধ প্রতিরোধে ৫৩ বিজিবি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরু ও মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে ৫৩ বিজিবি সংকল্পবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সীমান্তের দুর্গম এলাকায় ও নদী পথে অতিরিক্ত বিশেষ টহল, চেকপোস্ট পরিচালনা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।


সার্চ টুডে

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজাম্মুল হোসেন
বার্তা সম্পাদক: মোঃ হুমায়ূন কবীর
লিগ্যাল এডভাইজার: সৌরভ গাঙ্গুলি
উপদেষ্টা: সাজ্জাদ আলম খান সজল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সার্চটুডে