দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, বড় দুর্যোগের আশঙ্কা
দেশে ভবন নির্মাণ ও তদারকির জন্য পর্যাপ্ত আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ না হওয়ায় ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করছে।শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘ভূমিকম্প পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব উদ্বেগ তুলে ধরেন বক্তারা। ‘প্রগতিশীল প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি সমাজ’ আয়োজিত এই সেমিনারে ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবেলায় বহুমুখী উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।আইন বাস্তবায়নে বড় বাধা আমলাতন্ত্রবুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, দেশে ভবন নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৬০টির বেশি আইন বা আইনি কাঠামো রয়েছে। তবে এসব আইন বাস্তবায়ন অত্যন্ত সীমিত।তার মতে, “আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আইন বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”তিনি আরও বলেন, বিজ্ঞানসম্মত নগর পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোডের কঠোর প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে পারলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সাব্বির আহমেদ বলেন, “ভূমিকম্পে নয়, মানুষ মারা যায় ভবন ধসে।” তার মতে, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই সদিচ্ছা ছাড়া গবেষণা ও নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব নয়।
ভৌগোলিক অবস্থানেই ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত, যা দেশটিকে প্রাকৃতিক ভাবেই ভূমিকম্প প্রবণ করে তুলেছে। তিনি জানান, উত্তরের ‘ডাউকি ফল্ট’ এবং পূর্বের ‘চিটাগাং কোস্টাল ফল্ট’ অতীতে বড় ভূমিকম্পের উৎস ছিল। যদিও ঢাকার নিচ দিয়ে কোনো সাবডাকশন জোন থাকার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।তার মতে, দেশের নরম মাটির কারণে ভূমিকম্পের কম্পন বেশি অনুভূত হয় এবং ঘনবসতি ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে যথাযথ প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে সংগঠনের আহ্বায়ক মীর মোশাররফ হোসেন চৌধুরী জানান, গত ছয় মাসে দেশে অন্তত শতাধিক ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে, যা বড় ধরনের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।তিনি বলেন, দেশে ভূমিকম্পসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি রয়েছে। সিসমোগ্রাফ পরিচালনায় প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং ভূতাত্ত্বিক তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঝুঁকি বিশ্লেষণকে জটিল করে তুলছে।বক্তারা জানান, রাজধানী ঢাকায় প্রায় ছয় লাখ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। রাজউকের ডিজিটাল সিস্টেম চালু থাকলেও অনুমোদন পেতে এখনো ঘুষ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, যা সুশাসনের অভাবকেই সামনে আনে।সেমিনারে বক্তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেনঃ* তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ভবন নিরাপত্তা পরীক্ষা* প্রকৌশলীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ* বিল্ডিং কোড হালনাগাদ ও কঠোর প্রয়োগ* এলাকা-ভিত্তিক প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল গঠন* দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ বাজেট বরাদ্দ* জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করাবিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু প্রস্তুতি ও সুশাসনের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়। আর এজন্য প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ, দুর্নীতির লাগাম টানা এবং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ। অন্যথায়, ভবিষ্যতের কোনো বড় ভূমিকম্প দেশের জন্য ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।