সার্চ টুডে

তুরস্ক-সৌদি-মিসর-পাকিস্তান জোটে আলজেরিয়া



তুরস্ক-সৌদি-মিসর-পাকিস্তান জোটে আলজেরিয়া
ছবি : সংগৃহীত

আলজেরিয়া ও তুরস্কের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং এই সম্পর্ক আরো গভীর হচ্ছে দিন দিন। তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আফ্রিকা মহাদেশের মুসলিম এই দেশটির তুরস্ক-সৌদি আরব-পাকিস্তান-মিসর জোটে যোগদানের সম্ভাবনাও ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতির বিশ্লেষকরা।

আলজেরিয়া-তুরস্কের সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল ১৫১৬ সালে, যখন উসমানীয় সুলতান প্রথম সেলিমের অধীনে বারবারোসা ভ্রাতৃদ্বয় ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শক্তিগুলোর সম্প্রসারণবাদী ও ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে আলজেরিয়ার উপকূল রক্ষা করেছিলেন। ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভূমধ্যসাগরীয় ভূরাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিকসহ নানা ঘটনাবলির মাধ্যমে আলজেরিয়া ও তুরস্কের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত অভিন্ন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে উৎসাহিত করেছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের তুরস্কে রাষ্ট্রীয় সফর দুই দেশের ঐতিহাসিক এবং শক্তিশালী সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকেই তুলে ধরে।


এর আগে তেব্বুন ২০২২ সালের মে মাসে এবং আবার ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তুরস্ক সফর করেন। তার শেষের সফরটির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। অন্যদিকে, এরদোয়ান ২০২০ সালের জানুয়ারি এবং ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে আলজেরিয়া সফর করেন। এই সফরগুলো আলজেরিয়া-তুরস্ক সম্পর্কে একটি গুণগত উন্নয়নের প্রতিনিধিত্ব করে, যা দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে একটি দৃঢ় কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপান্তরিত করেছে এবং উচ্চ স্তরের কৌশলগত সহযোগিতা পরিষদের মাধ্যমে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। তেব্বুনের এবারের সফরকালে আঙ্কারায় তার ও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, খনিজ, পরিবহনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে ১৪টি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) যে আমূল পরিবর্তন ঘটছে, তার মধ্যেই তুরস্কে আলজেরীয় প্রেসিডেন্টের এই সফরটি হচ্ছে। আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উভয় দেশের কূটনৈতিক ভূমিকার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে, আলজেরিয়ার জ্বালানি কূটনীতির, যা দেশটির কৌশলগত জোট গঠনের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে ক্ষমতার একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, যা আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতাকে নতুন রূপ দেবে।


মেনা অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অক্ষ বা জোট গঠিত হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ চারটি দেশ। এই কাঠামোতে আলজেরিয়ার যোগদান সমগ্র অঞ্চলে বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। এই প্রেক্ষাপটেই আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের তুরস্কে ৬ থেকে ৮ মে পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের সময়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তুরস্কে প্রেসিডেন্ট তেব্বুনের এটি তৃতীয় সফর। এবারের সফরটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আলজেরিয়া এই অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আলজেরিয়ার ভূমিকা দেশটির অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে আলজেরিয়া অন্যতম এবং আফ্রিকা ও ইউরোপে গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি।

আলজেরিয়ার ভূ-অর্থনৈতিক এই শক্তি তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে সাম্প্রতিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে আরো গভীরতা প্রদান করেছে। এই দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গেই আলজেরিয়ার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে এবং এ কারণে দেশটি আঙ্কারা-রিয়াদ অক্ষকে শক্তিশালী করতে জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলজেরিয়ার দীর্ঘদিনের কূটনীতি, মধ্যস্থতা, রাজনৈতিক পুনর্মিলন এবং সংঘাত নিরসন প্রক্রিয়ায় দেশটির গুরুত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আঙ্কারা-রিয়াদ জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আলজেরিয়া এই জোটকে আরো সুসংহত করতে সাহায্য করবে, যা মেনা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক গতিপথকে নতুন রূপ দেবে। এ ধরনের ঘটনাপ্রবাহ ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে স্বাক্ষরিত তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তির গতিকেও মন্থর করে দিতে পারে। অনেক সমালোচক আব্রাহাম চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণকারী একটি চুক্তি হিসেবে দেখেন।

আস্থার সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা

তুরস্ক সফরকালে প্রেসিডেন্ট তেব্বুনের তুরস্ক-আলজেরিয়া উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সহযোগিতা পরিষদের প্রথম বৈঠকে যোগদান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করেছে। রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ২০০৬ সালে আলজেরিয়া সফর করেন। এই সফরকালে দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী ও সহযোগিতা যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটাই দুই দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কৌশলগত অংশীদারত্বের মূল কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সংলাপকে জোরদার করা। বর্তমানে এই চুক্তিটি একটি বিস্তৃত কাঠামোতে পরিণত হয়েছে যা দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রেকর্ড ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং তুরস্ক ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে চায়।

বর্তমানে আলজেরিয়ায় প্রায় ১ হাজার ৪০০টি তুর্কি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা তুরস্ককে হাইড্রোকার্বন খাতের বাইরে আলজেরিয়ার বৃহত্তম বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তুর্কি সংস্থাগুলো আলজেরীয়দের জন্য হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে ২০২৭ সাল পর্যন্ত তুরস্কে আলজেরিয়ার গ্যাস রপ্তানি সম্প্রসারণ, লোহা ও ইস্পাত, বস্ত্র এবং কৃষি খাতে সহযোগিতা এবং আলজেরিয়ার ব্যাংকিং বাজারে তুরস্কের জিরাত ব্যাংকের প্রবেশ।

জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তুরস্ক আলজেরিয়ার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয় বার্ষিক ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনমিটার থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনমিটারে নিতে চায় । দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করার জন্য এই চুক্তিটি আরো পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য বাড়ানো হতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতার মধ্যে তুরস্কের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ এবং বলকান অঞ্চলে আলজেরিয়ার এলএনজি পরিবহনের সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উভয় দেশ এই কৌশলগত জ্বালানি করিডোরগুলো প্রতিষ্ঠা করতে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।

জিলহজের প্রথম দশকের মর্যাদা ও আমলজিলহজের প্রথম দশকের মর্যাদা ও আমল

নেতাদের সৌহার্দ্য, দেশগুলোর ঐক্য

কূটনৈতিক মঞ্চে এরদোয়ান ও তেব্বুনের দৃঢ় ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে ঐক্যকে আরো শক্তিশালী করেছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, সুদানের সংকট, ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা এবং গাজায় চলমান যুদ্ধসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলজেরিয়া এবং তুরস্ক একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছে।

বিশ্ব যখন একটি বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উভয় দেশই ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা-নিরপেক্ষ এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ কূটনৈতিক উদ্যোগকে সমর্থন করে আসছে। ফিলিস্তিন এবং পশ্চিম সাহারার মতো ইস্যুগুলোয় কূটনৈতিক সমর্থন আরো জোরদার করেছে আলজেরিয়া। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি প্রণয়নেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে দেশটি। বিশেষ করে, আফ্রিকা এবং মেনা অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের বিরুদ্ধে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এবং এর পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের ভেটো ক্ষমতার সমালোচনা করে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দেওয়া ‘বিশ্ব পাঁচের চেয়েও বড়’ স্লোগান আন্তর্জাতিক অঞ্চলে সাড়া ফেলেছে। জাতিসংঘকে সংস্কারের মাধ্যমে আরো প্রতিনিধিত্বমূলক করার জন্য এরদোয়ানের আহ্বানকে সমর্থন করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে আলজেরীয় প্রেসিডেন্টের দেওয়া বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরই প্রমাণ বহন করে।

বিশেষ করে, প্রতিরক্ষা ও সামরিক খাতে তুরস্ক এবং আলজেরিয়ার সম্পর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দেশ দুটি সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিশেষ করে ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং গোলাবারুদ যৌথভাবে উৎপাদন ও উন্নয়নে কাজ করছে। আলজেরিয়া বর্তমানে উত্তর আফ্রিকায় তুরস্কের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তেব্বুনের এবারের তুরস্ক সফর দুই নেতার মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রসায়নও তৈরি করেছে এবং নতুন ভূরাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচনে সুদৃঢ় নেতৃত্বের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলসহ আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে ফরাসি প্রভাব এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তুরস্ক-আলজেরিয়া ক্রমেই অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছে। দুই নেতা এই অভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো গভীর এবং আঞ্চলিক নীতিগুলোকে সমন্বিত করছেন। এতে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, টেকসই উন্নয়ন এবং যৌথ সমৃদ্ধির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মানবিক কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সার্চ টুডে

শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬


তুরস্ক-সৌদি-মিসর-পাকিস্তান জোটে আলজেরিয়া

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

featured Image

আলজেরিয়া ও তুরস্কের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং এই সম্পর্ক আরো গভীর হচ্ছে দিন দিন। তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আফ্রিকা মহাদেশের মুসলিম এই দেশটির তুরস্ক-সৌদি আরব-পাকিস্তান-মিসর জোটে যোগদানের সম্ভাবনাও ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতির বিশ্লেষকরা।


আলজেরিয়া-তুরস্কের সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল ১৫১৬ সালে, যখন উসমানীয় সুলতান প্রথম সেলিমের অধীনে বারবারোসা ভ্রাতৃদ্বয় ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শক্তিগুলোর সম্প্রসারণবাদী ও ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে আলজেরিয়ার উপকূল রক্ষা করেছিলেন। ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভূমধ্যসাগরীয় ভূরাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিকসহ নানা ঘটনাবলির মাধ্যমে আলজেরিয়া ও তুরস্কের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত অভিন্ন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে উৎসাহিত করেছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের তুরস্কে রাষ্ট্রীয় সফর দুই দেশের ঐতিহাসিক এবং শক্তিশালী সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকেই তুলে ধরে।




এর আগে তেব্বুন ২০২২ সালের মে মাসে এবং আবার ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তুরস্ক সফর করেন। তার শেষের সফরটির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। অন্যদিকে, এরদোয়ান ২০২০ সালের জানুয়ারি এবং ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে আলজেরিয়া সফর করেন। এই সফরগুলো আলজেরিয়া-তুরস্ক সম্পর্কে একটি গুণগত উন্নয়নের প্রতিনিধিত্ব করে, যা দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে একটি দৃঢ় কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপান্তরিত করেছে এবং উচ্চ স্তরের কৌশলগত সহযোগিতা পরিষদের মাধ্যমে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। তেব্বুনের এবারের সফরকালে আঙ্কারায় তার ও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, খনিজ, পরিবহনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে ১৪টি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।




ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) যে আমূল পরিবর্তন ঘটছে, তার মধ্যেই তুরস্কে আলজেরীয় প্রেসিডেন্টের এই সফরটি হচ্ছে। আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উভয় দেশের কূটনৈতিক ভূমিকার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে, আলজেরিয়ার জ্বালানি কূটনীতির, যা দেশটির কৌশলগত জোট গঠনের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে ক্ষমতার একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, যা আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতাকে নতুন রূপ দেবে।


মেনা অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অক্ষ বা জোট গঠিত হচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ চারটি দেশ। এই কাঠামোতে আলজেরিয়ার যোগদান সমগ্র অঞ্চলে বৃহত্তর কৌশলগত সহযোগিতাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে। এই প্রেক্ষাপটেই আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনের তুরস্কে ৬ থেকে ৮ মে পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের সময়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


তুরস্কে প্রেসিডেন্ট তেব্বুনের এটি তৃতীয় সফর। এবারের সফরটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আলজেরিয়া এই অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আলজেরিয়ার ভূমিকা দেশটির অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে আলজেরিয়া অন্যতম এবং আফ্রিকা ও ইউরোপে গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি।


আলজেরিয়ার ভূ-অর্থনৈতিক এই শক্তি তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে সাম্প্রতিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে আরো গভীরতা প্রদান করেছে। এই দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গেই আলজেরিয়ার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে এবং এ কারণে দেশটি আঙ্কারা-রিয়াদ অক্ষকে শক্তিশালী করতে জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলজেরিয়ার দীর্ঘদিনের কূটনীতি, মধ্যস্থতা, রাজনৈতিক পুনর্মিলন এবং সংঘাত নিরসন প্রক্রিয়ায় দেশটির গুরুত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আঙ্কারা-রিয়াদ জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আলজেরিয়া এই জোটকে আরো সুসংহত করতে সাহায্য করবে, যা মেনা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক গতিপথকে নতুন রূপ দেবে। এ ধরনের ঘটনাপ্রবাহ ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে স্বাক্ষরিত তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তির গতিকেও মন্থর করে দিতে পারে। অনেক সমালোচক আব্রাহাম চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণকারী একটি চুক্তি হিসেবে দেখেন।


আস্থার সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা


তুরস্ক সফরকালে প্রেসিডেন্ট তেব্বুনের তুরস্ক-আলজেরিয়া উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সহযোগিতা পরিষদের প্রথম বৈঠকে যোগদান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করেছে। রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ২০০৬ সালে আলজেরিয়া সফর করেন। এই সফরকালে দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী ও সহযোগিতা যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটাই দুই দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কৌশলগত অংশীদারত্বের মূল কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সংলাপকে জোরদার করা। বর্তমানে এই চুক্তিটি একটি বিস্তৃত কাঠামোতে পরিণত হয়েছে যা দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রেকর্ড ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং তুরস্ক ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে চায়।


বর্তমানে আলজেরিয়ায় প্রায় ১ হাজার ৪০০টি তুর্কি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা তুরস্ককে হাইড্রোকার্বন খাতের বাইরে আলজেরিয়ার বৃহত্তম বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তুর্কি সংস্থাগুলো আলজেরীয়দের জন্য হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে ২০২৭ সাল পর্যন্ত তুরস্কে আলজেরিয়ার গ্যাস রপ্তানি সম্প্রসারণ, লোহা ও ইস্পাত, বস্ত্র এবং কৃষি খাতে সহযোগিতা এবং আলজেরিয়ার ব্যাংকিং বাজারে তুরস্কের জিরাত ব্যাংকের প্রবেশ।


জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে তুরস্ক আলজেরিয়ার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয় বার্ষিক ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনমিটার থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনমিটারে নিতে চায় । দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করার জন্য এই চুক্তিটি আরো পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য বাড়ানো হতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতার মধ্যে তুরস্কের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ এবং বলকান অঞ্চলে আলজেরিয়ার এলএনজি পরিবহনের সম্ভাবনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উভয় দেশ এই কৌশলগত জ্বালানি করিডোরগুলো প্রতিষ্ঠা করতে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।


জিলহজের প্রথম দশকের মর্যাদা ও আমলজিলহজের প্রথম দশকের মর্যাদা ও আমল

নেতাদের সৌহার্দ্য, দেশগুলোর ঐক্য


কূটনৈতিক মঞ্চে এরদোয়ান ও তেব্বুনের দৃঢ় ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে ঐক্যকে আরো শক্তিশালী করেছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, সুদানের সংকট, ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা এবং গাজায় চলমান যুদ্ধসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে আলজেরিয়া এবং তুরস্ক একসঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করছে।


বিশ্ব যখন একটি বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন উভয় দেশই ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা-নিরপেক্ষ এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ কূটনৈতিক উদ্যোগকে সমর্থন করে আসছে। ফিলিস্তিন এবং পশ্চিম সাহারার মতো ইস্যুগুলোয় কূটনৈতিক সমর্থন আরো জোরদার করেছে আলজেরিয়া। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি প্রণয়নেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে দেশটি। বিশেষ করে, আফ্রিকা এবং মেনা অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের বিরুদ্ধে।


জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এবং এর পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের ভেটো ক্ষমতার সমালোচনা করে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দেওয়া ‘বিশ্ব পাঁচের চেয়েও বড়’ স্লোগান আন্তর্জাতিক অঞ্চলে সাড়া ফেলেছে। জাতিসংঘকে সংস্কারের মাধ্যমে আরো প্রতিনিধিত্বমূলক করার জন্য এরদোয়ানের আহ্বানকে সমর্থন করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে আলজেরীয় প্রেসিডেন্টের দেওয়া বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরই প্রমাণ বহন করে।


বিশেষ করে, প্রতিরক্ষা ও সামরিক খাতে তুরস্ক এবং আলজেরিয়ার সম্পর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দেশ দুটি সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিশেষ করে ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং গোলাবারুদ যৌথভাবে উৎপাদন ও উন্নয়নে কাজ করছে। আলজেরিয়া বর্তমানে উত্তর আফ্রিকায় তুরস্কের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


তেব্বুনের এবারের তুরস্ক সফর দুই নেতার মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রসায়নও তৈরি করেছে এবং নতুন ভূরাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচনে সুদৃঢ় নেতৃত্বের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলসহ আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে ফরাসি প্রভাব এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির প্রভাবকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তুরস্ক-আলজেরিয়া ক্রমেই অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছে। দুই নেতা এই অভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো গভীর এবং আঞ্চলিক নীতিগুলোকে সমন্বিত করছেন। এতে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, টেকসই উন্নয়ন এবং যৌথ সমৃদ্ধির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মানবিক কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।


সার্চ টুডে

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজাম্মুল হোসেন
বার্তা সম্পাদক: মোঃ হুমায়ূন কবীর
লিগ্যাল এডভাইজার: সৌরভ গাঙ্গুলি
উপদেষ্টা: সাজ্জাদ আলম খান সজল

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত সার্চটুডে